Friday , 17 August 2018
আপডেট
Home » শেষের পাতা » চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা
চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা

চিকিৎসা সেবায় বাংলাদেশের সমস্যা ও সম্ভাবনা

কিছু দিন আগে দ্বিতীয় বারের মতো ব্যাংককের বামরুংগ্রাদ (Bumrungrad) হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম। যে ডাক্তারকে গত কিস্তিতে দেখিয়েছিলাম তার এ্যাপয়েন্টমেন্ট দেশে ফেরার দিন পর্যন্ত ফিলাপ। মন খারাপ হলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হলো। হিম (আমার মেয়ে) আমাকে জিজ্ঞেস করলো কী করা যায় ? আমি নিরুত্তর। সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছিলাম। হিম ছায়ার মতো আমাকে ঘিরে থাকে। এবার ব্যাংকক আসার সময় ওকে ডাক্তার দেখাবো বলেছিলাম। দেশে থাকতে রাজি হলেও এখানে এসে বেঁকে বসলো। ও বললো, আমি দেশে ফিরে ডাক্তার দেখাবো। অনেক চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে আমিই চিকিৎসার জন্য মেয়েকে সাথে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। একজন ডাক্তারের এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়া হলো। এ্যাপয়েন্টমেন্ট নেয়ার পর হিম বললো আমাদের দেশে এর চেয়েও ভালো চিকিৎসা হয়। আমি বিস্মিত হলাম না। কারণ হিম ডাক্তারী শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় তা-ই মনে হলো। আমি গত জুনের ২৮ তারিখে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম। ডাক্তার সাহেব বাংলাদেশের ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্রে কিছু ঔষুধ যোগ বিয়োগ করেছিলেন মাত্র। শরীর ভালো না লাগলে তিন মাস পর আবার আসতে বলেছিলেন। ওনার ঔষুধ ব্যবহার করে মাস দু’য়েক ভালোই ছিলাম। দু’মাস পরে শরীর আগের মতোই ব্যাড সিগন্যাল দিতে শুরু করলো। মনে মনে ভাবলাম ঔষুধে কাজ হচ্ছে না কোনো ? নানা কথা মনে আসতে লাগলো। একবার মনে হলো ব্যবস্থাপত্র কি এমনটি যে, তিন মাস পরে যেন রোগী আবার আসতে বাধ্য হয় ? এটা কী তা হলে গ্যারান্টি দেয়া চায়নিজ ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যের মতো যা মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার ঠিক ১৫/২০ দিন পরে বিকল হয়ে পড়ে যার দরুণ গ্যারান্টি সময়টি উত্তীর্ণ হয়ে যায়। বামরুংগ্রাদ (Bumrungrad) হাসপাতালের ডাক্তার কী তাহলে চিকিৎসার নাম করে রোগি আনার কৌশলী চিকিৎসা করছেন যাতে থাইল্যান্ডে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করার চমৎকার ব্যবসাও হয়ে যায় ? একবার মনে হলো গরিব দেশের রোগী বার বার মেয়াদ সীমা দিয়ে চিকিৎসা করানোর ক্ষেত্রে ব্যয়ভার বহন করার ক্ষমতা কি ডাক্তার সাহেবরা একবারও চিন্তা করেন না ? যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য মানুষ অর্থ সংকটের মধ্যেও উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ বিভূঁইয়ে চলে যায়। এ সুযোগে রোগ বালাই আর রোগী নিয়ে কি তাহলে ব্যবসা শুরু হয়েছে ? হিমই বা এতোদিন একথা বলেনি কেনো ? আরো অনেক কথাই মনে একে একে আসতে লাগলো। হাসপাতালের বাইরে এসে হিমকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি এ সব কথা আমাকে আগে জানালে না কেনো ? ও বললো, আব্বু, মেডিকেলের বই তো সারা দুনিয়ায় একই। বিশ্বের উন্নত-অনুন্নত সব দেশে একই বই পড়ে ডাক্তারী ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। দুনিয়া জুড়ে রোগের একই চিকিৎসা পদ্ধতি। রোগ ও রোগীর মানবদেহের উপাদান একই প্রকার। রোগের চিকিৎসা পদ্ধতিও একই ধরণের। কয়েকটি ক্ষেত্রে সামান্য পার্থক্য আছে। রোগীর রোগ সনাক্ত করা এর মধ্যে অন্যতম। ডাক্তারের আন্তরিকতার বিষয়টিও রোগ উপশমের ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখে। আরেকটি বিশেষ কারণ হলো বাংলাদেশে ডাক্তারের প্রতি রোগীর অবিশ্বাস সৃষ্টি। এটি বড়ো সমস্যা। আরো একটি সমস্যা বর্তমানে খুব প্রকট। তা হলো বাংলাদেশের ডাক্তারদের বিরুদ্ধে প্রচার মাধ্যম প্রায়ই নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। হিমের সবগুলো কথাই সত্য। কারণ ওকে এখন পর্যন্ত মিথ্যা বলতে শুনিনি। তা’ছাড়া আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাও তা-ই বলে। আমি সবগুলো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, টেলিভিশনে প্রচারিত একাধিক অনুষ্ঠানে ডাক্তারদের সচেতন করার নামে অসংখ্য নেতিবাচক ঘটনা প্রচারের দৃশ্যগুলো আমার মানস পটে এক এক করে ভেসে উঠলো। আমার অনেক পরিচিত ও কাছের মানুষের নিকট হতে বিশেষ করে ভারতে, ব্যাংককে চিকিৎসা করা নিয়ে এমনই কিছু অভিজ্ঞতা বা করুণ পরিণতির কথা মনে পড়ে গেলো। একই রোগের চিকিৎসায় মনে সাহস নিয়ে দেশেই চিকিৎসা করে অনেকে ভালো আছেন আবার ঐ একই চিকিৎসায় বাইরে গিয়ে কেউ পঙ্গু হয়েছেন কেউ বা যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুবরণ করেছেন। চিকিৎসায় মৃত্যু রোধ করার উপায় নেই। আল্লাহ ছাড়া আর কারো হাতে পূর্ণ সুস্থতার ক্ষমতাও নেই। ডাক্তাররা উপশমের ব্যবস্থা পত্র দিতে পারেন মাত্র। অন্য কিছুই না।
এতো কিছুর পরও কেনো মানুষ বিদেশে চিকিৎসা করাতে যায় ? চিকিৎসার টাকা ধার করে বা জমি বিক্রি করে অনেকে বাইরের দেশে চিকিৎসা নিতে চলে যান। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবার কিছু কারণও আছে। বাংলাদেশে বড় মাপের ডাক্তারের অভাব নেই। যে সব দেশে আমরা চিকিৎসা নিতে যাই সেখানকার অনেক ডাক্তারই বাংলাদেশের ডাক্তারদের চিকিৎসা বিদ্যার পারদর্শিতা ও দক্ষতার প্রশংসা করেন। তার পরও রোগী বিদেশে চলে যায়। অনেক কারণের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি কারণ আমার অভিজ্ঞতা হতে তুলে ধরছি। আমাদের ভালো মানের ডাক্তাররা একদিনে অনেক রোগী দেখেন। তাদের প্রচন্ড দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে ২/৪মিনিটে রোগীর ব্যবস্থা পত্র দিয়ে থাকেন। রোগীর বক্তব্য শোনার মতো, রোগীর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার মতো সময় তারা হাতে রাখতে পারেন না। পরবর্তী সিরিয়ালে থাকা রোগীর জন্য তারা উদগ্রীব থাকেন । যতো রোগী দেখতে পারবেন তত টাকার অংক বেড়ে যায়। এটাকে বাণিজ্যিক চিকিৎসা বলেও অনেকে মন্তব্য করেন। তার পর বিভিন্ন পরিক্ষা। এতে অপ্রয়োজনীয় পরিক্ষা দ্বারা রোগীকে বেশি টাকা গুণতে হয়। রোগ নির্ণয়ের ত্রুটির কারণে ব্যবস্থাপত্রেও ত্রুটি দেখা দেয়। যোগ্য-দক্ষ টেকনিশিয়ান না থাকায় রিপোর্ট সঠিক হয় না। এতে ওষুধের প্রতিক্রিয়া বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়। ওষুধে ভেজাল বা নকল ওষুধে রোগীর রোগ যন্ত্রণাই শুধু বাড়ায় না, অনেক ক্ষেত্রে তা জীবনপাত ঘটায়। সর্বোপরি ওষুধের মান সঠিক মাত্রার না থাকায় রোগীর কষ্ট বেড়ে যায়। রোগ নির্ণয়ের উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন যন্ত্রাদি এবং যোগ্য-দক্ষ, প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের দ্বারাই সঠিক রোগ নির্ণয় রিপোর্ট তৈরী করা সম্ভব। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর ডাক্তারদের আন্তরিকতাপূর্ণ ব্যবস্থাপত্রের সাথে মানসম্পন্ন ওষুধ হলে রোগীর বিদেশ যাবার কোনো দরকার নেই। এতে দেশের টাকা দেশেই থাকবে এবং রোগীরও উপকার হবে। রোগীকে বাইরের দেশে চিকিৎসা বাণিজ্যের শিকার হতে হবে না। ভালো-খারাপ দু’দিক থেকেই আমাদের খ্যাতি আছে। খারাপটুকু বাদ দিলে ভালোর পরিমানই বেশি। আমাদের প্রত্যাশা চিকিৎসা সহ সবক্ষেত্রে খারাপটুকু বাদ দিয়ে আমরা ভালোকে আঁকড়ে ধরবো। তাহলেই স্বপ্নের সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তব হয়ে সোনা ফলাবে।
লেখক: প্রধান শিক্ষক
শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়, টঙ্গী, গাজীপুর।
মোবাইল নং- ০১৮৫৬-৪৭০০৫০
Email : sshs.tongi@ yahoo.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*