
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠন করেছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন উইংয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৩৮টি ক্যাটাগরির পদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা সংশোধন করা হয়েছে। আর এতেই মহাব্যবস্থাপকসহ বিএডিসির প্রায় সব পদের বেতনগ্রেড কমপক্ষে একধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ফিডার পদে’ চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিএডিসির বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করে পত্র জারি করেছে অর্থমন্ত্রণালয়। কৃষি সচিব বরাবর অর্থবিভাগের উপসচিব মো. সোহেল মারুফ স্বাক্ষরিত পত্র অনুযায়ী, ৯১টি ক্যাটাগরির ৪ হাজার ৬৯৯টি পদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা নির্ধারণ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ৩৮টি ক্যাটাগরির পদের বেতনগ্রেড ও নিয়োগযোগ্যতা সংশোধন করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিএডিসির বিভিন্ন পদের বেতন স্কেল, পদের সংখ্যা এবং নিয়োগ ও পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে, নতুন এই আদেশের পরপরই বিএডিসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে । কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন আদেশে মহাব্যবস্থাপকসহ প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব পদের বেতনগ্রেড কমপক্ষে একধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ‘ফিডার পদে’ চাকরির মেয়াদ অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে জাতীয় বেতন স্কেলের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক শর্ত চাপানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এমন প্রজ্ঞাপনের প্রতিবাদে আজ (মঙ্গলবার) থেকে দেশব্যাপী অর্ধদিবস কর্মবিরতিসহ কৃষি ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।
অর্থবিভাগের জারিকৃত আদেশে বলা হয়েছে, বিএডিসির শীর্ষ পদ ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে সরকারের গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মধ্য হতে প্রেষণে স্ববেতনে নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া ৪টি ‘পরিচালক’ পদে সরকারের যুগ্মসচিব অথবা অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য হতে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে ‘সচিব’ (১টি পদ) পদের ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রের নির্দেশনা অনুযায়ী পদ ও নাম পরিবর্তনপূর্বক কৃষি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত খসড়া নিয়োগবিধি প্রেরণের পর বেতনগ্রেড নির্ধারণ করা হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মহাব্যবস্থাপকসহ বিভিন্ন পদের গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে।
নবম পে-স্কেল: ভাতা দেওয়া শুরু হবে ২০২৮ সালে
আদেশ কার্যকরের জন্য বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, বিএডিসিকে অনতিবিলম্বে এই নতুন নিয়োগযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্তাবলী মেনে তাদের প্রবিধানমালা বা নিয়োগবিধি প্রণয়ন ও সংশোধন করতে হবে । তবে এই বিধিমালা চূড়ান্ত করার আগে অবশ্যই অর্থ বিভাগের বাধ্যতামূলক মতামত ও সম্মতি নিতে হবে এবং প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। যেসব পদ আউটসোর্সিং পদ হিসেবে সৃজিত বা বিলুপ্ত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের ‘আউটসোর্সিং সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৩’ কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। নতুন এই আদেশের মাধ্যমে চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি জারিকৃত আদেশটি বাতিল ঘোষণা করেছে অর্থ বিভাগ।
তবে নতুন এই আদেশে বিএডিসির প্রায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চলমান গ্রেড এক ধাপ অবনমন হয়েছে। বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, এতদিন প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক এবং প্রধান প্রকৌশলী পদগুলো ছিল দ্বিতীয় গ্রেডের, কিন্তু নতুন আদেশে তাদেরকে তৃতীয় গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এক ধাপ নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে তৃতীয় গ্রেডের অতিরিক্ত পরিচালক ও অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক পদগুলো গ্রেড-৪, গ্রেড ৪ এর উপপ্রধান প্রকৌশলী, যুগ্মপ্রধান ও যুগ্মহিসাব নিয়ন্ত্রক পদগুলো গ্রেড-৫ এবং ৫ম গ্রেডের উপপরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী পদগুলোকে গ্রেড-৬ ভুক্ত করা হয়েছে। অন্য প্রায় সব পদগুলোকে একইভাবে একধাপ অবনমন করা হয়েছে।
সদস্য পরিচালক পদে নিজস্ব কর্মকর্তাদের পথ বন্ধ:
অর্থবিভাগের আদেশে বলা হয়েছে, বিএডিসির ৪টি ‘পরিচালক’ পদে সরকারের যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিবগণের মধ্য হতে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বিএডিসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের সদস্য পরিচালক বা উচ্চতর পদে যাওয়ার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ অতীতে বিএডিসির বহু কর্মকর্তা সফলতার সাথে সদস্য পরিচালক এমনকি চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাছাড়া এ ধরনের সংস্থায় সদস্য পরিচালক পদে নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক সার্কুলারও রয়েছে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে ফিডার পদের মেয়াদ বৃদ্ধি:
প্রজ্ঞাপনে ২য় গ্রেড প্রাপ্তির সুযোগ রাখা হলেও তার জন্য ৩য় গ্রেডে ৫ বছর চাকরিসহ মোট ২৪ বছরের চাকরির শর্তারোপ করা হয়েছে, একইভাবে ৫ম গ্রেডের পদোন্নতিতে ১৩ বছরের শর্ত দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী ২য় গ্রেড পেতে সাধারণত ১৭ বছরের চাকরির শর্ত থাকলেও, নতুন আদেশে ৩য় গ্রেড হতে তদূর্ধ্ব স্কেল প্রাপ্তির জন্য ২৪ বছরের দীর্ঘমেয়াদি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। একইভাবে, ৫ম গ্রেডে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রথাগত ১০ বছরের পরিবর্তে ১৩ বছরের অযৌক্তিক শর্ত দেওয়া হয়েছে ।
এছাড়া, ১৯৬১ সালে বিএডিসির জন্মলগ্ন থেকেই ‘নির্বাহী প্রকৌশলী’ পদটি ৫ম গ্রেডভুক্ত ছিল। কিন্তু অর্থ বিভাগের নতুন ভেটিং আদেশে প্রকৌশলীদের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদটিকে একধাপ নামিয়ে ৬ষ্ঠ গ্রেডে নির্ধারণ করা হয়েছে । শুরু থেকেই বিএডিসির ‘প্রধান চিকিৎসক’ পদটি ৪র্থ গ্রেডভুক্ত থাকলেও নতুন প্রজ্ঞাপনে তা কমিয়ে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ক্যাডার সার্ভিসের সমমর্যাদার সাথে স্পষ্ট বৈষম্য।
এদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়েরে সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে আদেশ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে বিএডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা কালবেলাকে জানান, অর্থমন্ত্রণালয়ের আদেশ বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) থেকেই দেশব্যাপী বিএডিসির সব কার্যালয়ে অর্ধদিবস কর্মবিরতি এবং বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর দিলকুশায় বিএডিসির প্রধান কার্যালয়ের ‘কৃষি ভবন’ সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। দাবি আদায় না হলে আগামী সপ্তাহ থেকে দেশব্যাপী বিএডিসির সব কার্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ এর মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।