
শুভ দেব চাকমা ( রাঙ্গামাটি): আসন্ন ১২ তারিখের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আলোচনা ও অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। জাতীয় রাজনীতিতে এই প্রক্রিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও পাহাড়ের মানুষের ভাবনায় উঠে আসছে দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, ভূমি সমস্যা এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের বহু বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধারা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ভূমি কমিশন গঠিত থাকলেও অধিকাংশ ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিহীন রয়ে গেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোর প্রত্যাশিত ক্ষমতা না থাকায় স্থানীয় শাসনব্যবস্থা কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বাস্তবতায় গণভোটে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে পাহাড়ের মানুষের প্রধান প্রশ্ন—এই সংস্কারে কি পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা, আদিবাসীদের স্বতন্ত্র পরিচয় এবং আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে?
রাঙামাটির বাসিন্দা নিউটন চাকমা বলেন, "আমরা নির্বাচন বা সংস্কারের বিরোধী নই। কিন্তু যে সংস্কারে পাহাড়ের ভূমি সমস্যা ও শান্তিচুক্তির বাস্তবায়নের বিষয়গুলো স্পষ্ট নয়, সেখানে ‘হ্যাঁ’ বলা আমাদের জন্য কঠিন।"
বান্দরবানের স্থানীয় বাসিন্দা মংসানু মারমা বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে আমরা শুধু আশ্বাস শুনে আসছি। ভূমি ফেরত না পাওয়া এবং নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে অসম্পূর্ণ সংস্কারকে সমর্থন করা মানে আবারও অপেক্ষাকে মেনে নেওয়া।"
রাঙামাটি-ভিত্তিক মানবাধিকার কর্মী বলেন, "পাহাড়ের মানুষের বক্তব্যগুলো পরিষ্কার। আমরা উন্নয়ন চাই, আমরা রাষ্ট্রের বিরোধী নই, কিন্তু নিজের ভূমি ও অধিকার নিশ্চিত না থাকলে কোনো সংস্কার গ্রহণযোগ্য হবে না।"
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো কোনো প্রার্থী দিচ্ছে না এবং নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও আলোচনা আরও বেড়েছে। অনেকের মতে, সংগঠনগুলোর নীরবতার মধ্যেই সাধারণ পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজেদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ও বর্তমান বাস্তবতার কঠোর আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে গণভোটে যদি ‘না’ ভোটের প্রবণতা দেখা যায়, তবে সেটিকে কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা হিসেবে না দেখে শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন, ভূমি সমস্যা এবং স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ ও ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত। এটি একটি গভীর আস্থা সংকটেরই ইঙ্গিতবাহী।
১২ তারিখের জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে পাহাড়ের মানুষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর কাছে এই নির্বাচন ও গণভোট কেবল একটি রাজনৈতিক আয়োজন নয়; এটি তাদের ভূমি, মর্যাদা ও অধিকার প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। অধিকাংশের মতে, একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কার ছাড়া এখানে স্থায়ী শান্তি ও উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। তাই পাহাড়ের মানুষের ভোট কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব, অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রতি একটি গভীর বিবেকের প্রতিফলন।