
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি অর্থের হরিলুট আর দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রমে। নামমাত্র কাজ বা কোনো কাজ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে এলজিইডির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী নাম হিসেবে উঠে এসেছে এলজিইডি বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের নাম।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যাদি: দুদক ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া, ভান্ডারিয়া, নাজিরপুর এবং সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পের অধীনে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। বিশেষ করে IBRP, CAFDARID, PDRIDP এবং BDIRWSP প্রকল্পের আওতায় কয়েকশ ‘ভুয়া ও কল্পিত’ স্কিম দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে যারা: তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতা হলেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (বরিশাল বিভাগ) শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। তার যোগসাজশে ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুস সাত্তার হাওলাদার, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলামসহ হিসাব রক্ষণ ও নিরীক্ষা বিভাগের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই অর্থ লোপাটে সরাসরি অংশ নিয়েছে।
লুটপাটের চিত্র: ১. ভুয়া স্কিম ও ডুপ্লিকেট বিল: নথিতে দেখা যায়, পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১২৮টি ভুয়া/কল্পিত স্কিম দেখিয়ে প্রায় ২৭ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট ও আয়কর বাদে সরাসরি আত্মসাত করা হয়েছে ২০ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকারও বেশি। ২. কাজ না করেই বিল প্রদান: ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের (CAFDARID) আওতায় পিরোজপুর জেলায় ৬৯টি ভুয়া স্কিম দেখিয়ে ২০ কোটি ৬৩ লক্ষ টাকার বেশি বিল উত্তোলন করা হয়েছে, যার বড় একটি অংশই গেছে পকেটস্থ কর্মকর্তাদের পকেটে। ৩. ঠিকাদারি সিন্ডিকেট: কর্মকর্তাদের নিজস্ব আত্মীয়-স্বজন বা বেনামি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজগুলো ভাগিয়ে নেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তদারকি না করে এবং কাজের কোনো পরিমাপ বই (এমবি) ছাড়াই ভুয়া বিল প্রস্তুত করা হয়েছে।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের ভূমিকা: তদন্ত সূত্র বলছে, শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকাকালীন এই অনিয়মগুলো সরাসরি অনুমোদন ও তদারকি করেছেন। প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না তা যাচাই না করেই তিনি কোটি কোটি টাকার বিল ছাড়ের সবুজ সংকেত দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই বিশাল অংকের টাকার একটি বড় লভ্যাংশ তার কাছে পৌঁছাত, যার বিনিময়ে তিনি অধস্তন কর্মকর্তাদের এই লুটপাটে উৎসাহ ও সুরক্ষা প্রদান করেছেন।
আইনি ব্যবস্থা: দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পিরোজপুর কর্তৃক দাখিলকৃত এজাহারে শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামসহ ২১ জন কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯/২০১ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকা এভাবে লুটপাট হওয়া রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য এক চরম অবমাননাকর ঘটনা। শেখ মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগ এলজিইডির ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলেছে। সাধারণ জনগণ এখন তাকিয়ে আছে আইনি প্রক্রিয়ার দিকে—এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হবে কি?